উফ্ শ্রাবণ! কেন এমন পাগলামি করেন?
এইটা কী আসার সময়?
হাহাহা… এর জন্য তো তুমি দায়ী!
আমি দায়ী মানে?
হুম, তোমার নামটিই যে তিথি, তিথির শ্রাবণ। তিথির বুকে ঝরার জন্য শ্রাবণের কোন নিদৃষ্ট সময় থাকতে হয় না বালিকা।
ক্ষণিকের জন্য তিথি চুপ হয়ে দুচোখ বন্ধ করে উপভোগ করে নিজের ভেতর ঘুমিয়ে থাকা শিহরণ টুকু।
ও পাশ থেকে ফিসফিস করে শ্রাবণ, এই মেয়ে
ঘুমোলে?
তিথির কানে যেন সত্যি সত্যি ভীষণ সুড়সুড়ি লাগে। ডুবে থাকা ঘোরে গলার আওয়াজটা কেমন যেন মাদকতায় জড়িয়ে যায়। একটা অদ্ভুত আচ্ছন্নতায় তিথি গুঙিয়ে ওঠে, কবি…!
-বলো,
-যা হচ্ছে তা ভালো হচ্ছে না। আপনার সংসার আছে। আমারও…। জানাজানি হলে সবাই বলবে, স্বামী আছে তবু কত খারাপ মহিলা! কবির সাথে পরকিয়ায় জড়িয়েছে।
-উমহু, প্রেম আমৃত্যু প্রেমই হয়। পরকীয়া শব্দটি বড্ড অশোভন। প্রেমের কোন সময় কাল বয়স থাকে না মেয়ে। শোনা যায় রবীন্দ্রনাথ তাঁর খেলার সাথী এবং বৌদি কাদম্বরীর সাথে হেসে খেলে বড় হতে হতে প্রেমে হাবুডুবু খেয়েছিলেন বালক বয়স থেকে যৌবনের শ্রেষ্ঠ সময়টিতেও। তাঁর কি অবিবাহিত সুন্দরী মেয়ের অভাব ছিল? তিনি তো সেই সময় বিদেশেও থেকেছেন। অথচ বৌদির প্রেমের প্রতি তাঁর কী প্রবল দাবদাহ! কী দুর্দমনীয় প্রেম যে, তিনি উচ্চ শিক্ষা, সুন্দরী বিদেশিনীদের প্রলোভন সবকিছু তুচ্ছ জ্ঞান করে ছেড়ে ছুটে চলে এলেন কাদম্বরীর কাছে! এই প্রেমকে তুমি কী বলবে? পরকীয়া? অস্পৃশ্য? ওই প্রেমটি না থাকলে রবি ঠাকুর হয়তো কখনো রবীন্দ্রনাথে পরিনতই হতে পারতেন না!
-বুঝলাম। কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের সময় তো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর বাবার বিরুদ্ধে যেতে পারেন নি। এবং নতুন বউ নিয়ে তিনি এতোটাই বিভোর ছিলেন যে বৌদি কাদম্বরী বলা যায় একরকম হতাশায় অন্তর্দহনে…
-না, চুপ করো। আর বলো না সোনা! এখন সময় বদলেছে। মানুষের মানসিকতাও বদলেছে। এতো ভেবো না। প্রেম মানুষের জীবনে সহজাত প্রবৃত্তি। যেটা আসার সেটা আসবেই। এই গতিকে বাধা দিও না। আর তুমি বাধা দিলেও প্রেম তা মানবে কেন? প্রেম দুর্বার, দুর্দান্ত কিন্তু মানুষ কখনো বোকা তাই সবকিছু চাপা দিয়ে রাখে, মানুষ কখনো বা অতি সাহসী তার প্রবৃত্তি আর চাওয়া পাওয়ার কাছে। বুঝেছেন হে বালিকা?
-আম্মু আমিও আব্বুর সাথে একটু কথা বলবো। মোবাইলটা দাও না আমাকে।
– মামনি আমি তোমার আন্টির সাথে কথা বলছি সোনা। তুমি ঘুমাও।
-আমি তো ঘুমাচ্ছিলামই। তোমার কথার শব্দে আমার ঘুম ভেঙে গেলো।
– এই আপু, আমি এখন রাখি কেমন। বলে লাইনটা কেটে দিলো তিথি। চার বছরের মেয়ে মৃত্তিকাকে বুকে টেনে নিয়ে মাথায় চুলে আদর করতে করতে ডুবে গেলো ভাবনার অতল সাগরে।
এই ছলচাতুরী কতদিন করবো নিজের সাথে, স্বামী সন্তানের সাথে? নিজেকেই প্রশ্ন করে তিথি। বুদ্ধিটা অবশ্য শ্রাবণেরই দেয়া। মোবাইলে শ্রাবণ নামটাও লেখা আছে ‘শ্রাবণী’ দিয়ে। কিন্তু কোন কিছু কি চিরদিন গোপন থাকে? না। থাকে না। সত্য হোক মিথ্যা হোক যে কোন কথা এবং ঘটনা প্রকাশ পেয়েই যায়। আমার এই ঘটনা জানাজানি হলে…! আর ভাবতে পারে না তিথি। শীতের রাতেও ঘামতে শুরু করে সে। যেন পায়ের তলায় মাটি সরে অতল শূন্যে পড়তে শুরু করে। পড়ছে তো পড়ছেই! বুক ঠেলে কান্না আসে। কিন্তু কানে বাজতে থাকে শ্রাবণের কন্ঠস্বর। এই মেয়ে, আমার বুকে এসো। তোমাকে জড়িয়ে ধরে তোমার চুলের ঘ্রাণ নিতে নিতে ঘুমোই এসো। তোমার নাকটা একটু ঘষে দাও আমার বুকে।
শ্রাবণ, এই শ্রাবণ কী বিড়বিড় করছো?
সুমির ধাক্কায় স্বপ্নটা ভেঙে যায় বাদলের। মনে মনে বউয়ের উপর বেশ খানিকটা বিরক্ত হলেও চোখ বন্ধ করেই কাছে টেনে নেয় সুমিকে। আদুরে গলায় বলে
উম্মমম… কেন আমার চমৎকার স্বপ্নটা ভেঙে দিলে মহারানী?
আমি কী করে বুঝবো তুমি স্বপ্ন দেখছো নাকি বোবা ধরলো তোমাকে? ঘুমের ভেতর তোমার নাক ডাকার শব্দে সারারাত আমার ঘুমের বারোটা বাজাও। এর পর আবার তোমার বিড়বিড়ানি! তোমাকে পাহারা দিতে দিতেই তো আমার জীবন শেষ! এখন ছাড়ো, পুষ্পিতা জেগে গেলে আরেক লজ্জায় পড়বো।
শ্রাবণ মনে মনে ভীষণদদরকম আহত হয়। তিথিকে নিয়ে দেখা স্বপ্নটা তিতা হয়ে গেলো সুমির খোঁচা মারা একগাদা কথাবার্তায়। কিন্তু সুমির সে দিকে কোন মনোযোগ নেই। স্বামী কিংবা কবির প্রেম রোমান্সের প্রতি কোন আগ্রহও নেই তার। সে থাকে তার গতানুগতিক জীবন নিয়ে। পাশ ফিরে শুতে গিয়েও বাদল নিজেকে মোটিভেট করে। গা ঝাড়া দিয়ে উঠে বললো,
-সুমি, তুমি ঘুমো, আমি ওয়াশরুম থেকে ফিরে মর্নিং ওয়াকে যাবো। ভোর হতে তো আর বেশি দেরি নেই।
-আচ্ছা যাও। সাবধানে যেও।
ভোর তখন সাড়ে চারটা বাজে। ভোরের শরীর মেখে আছে রাতের আবছা অন্ধকার। মুসল্লীদের দেখা যাচ্ছে সাদা টুপি মাথায় দিয়ে মসজিদের দিকে যেতে। একটা বাতাসের ঝাপটা ভেঙে পড়লো শ্রাবণের দেহের সাথে বাড়ি খেয়ে। বাতাসের সেই ভেঙে পড়ায় শ্রাবণ যেন খিলখিল হাসি শুনতে পেলো। হালকা শীতের কুয়াশা বাতাস মন ভিজিয়ে দিলো তার। ভুলে গেলো নিমিষেই সুমির খোঁচা দেয়া কথাগুলো। সুমির জায়গায় আলতো হাতে হাত ধরলো তিথি।
-কী কবি? একা একাই হাঁটবে? আমাকে সাথে নিবে না?
-তুমি তো আমার সাথেই থাকো সব সময়।
-আমি তোমার সাথে সারাজীবন থাকতে চাই শ্রাবণ। আমি এই সম্পর্কের একটি নাম চাই।
গম্ভীর কন্ঠে শ্রাবণ বলে, পরিনামহীন বন্ধুত্ব।এই সম্পর্কের নাম পরিনামহীন।
তিথির বয়স এখন কত হবে? আটত্রিশ-চল্লিস? স্বামী সন্তান নিয়ে আবার নতুন করে আরেকজনের স্বামীকে ভালো লাগা, ভালোবাসা….এটা কেন হয়? কী করে হয়? কেউ কী গভীর করে ভাবে? সাধারণ মানুষেরা হয়তো ভাবে না। কিন্তু আমার মত যারা প্রেমে পড়ে শুধু তারাই হয়তো ভাবে। যেমন আমার মৃত্তিকার স্কুলে এসে গার্ডিয়ান রুমে গসিপ করতে এখন আর ভালো লাগে না। পরিচিত ভাবিদের সাথে দেখা হলে ছোট্ট একটু হাসি আর ভালো মন্দ কুশল বিনিময়ে বন্ধুত্বের দায় শেষ করে বিভোর হয়ে যায় এই প্রেমের পরিনতি নিয়ে। হারিয়ে যায় অতীতে। মৃত্তিকার বাবার সাথে সেই ছোটবেলায় প্রেম হলো। হ্যা, ছোট বেলায়ই তো। তখন আমি মাত্র ক্লাস ফাইভে পড়ি। কী যে দুর্দান্ত ছিলাম! মনে পড়লে এখনো হাসি আসে। তখনো আমি প্রেমের মানে ভালো মত বুঝতাম না। অবশ্য না বোঝারই তো কথা। এখনকার মত তখন তো আর মোবাইল, ফেসবুক, আর ইউটিউবে হাতের মুঠোয় দুনিয়াটা ছিল না। মাঠে, বৃষ্টিতে ছুটাছুটি করাই ছিল আমাদের খেলা। এর গাছের আম পেড়ে খাওয়া। ওর প্রাচীরে উঠে ফুল চুরি করা! আর আমার এতোসব দুষ্টুমিকে ভালোবেসে ছিল আমার থেকে দশ বছরের বড় মালেক। আমি প্রেম ভালোবাসা সম্পর্কে এতো কিছু বুঝতাম না। একই গ্রামের বড় ভাই সে। বিকেলে আমাদের খেলার মাঠে এসে কখনো ফুটবল খেলতো, কখনো আমাদের কোলাহল দেখতো। ডাক দিলে কাছে যেতে হতো। সে আমার হাতটা খপাত করে ধরে হাতের ভেতর চকলেট গুঁজে দিয়ে বলতো, একা একা খাবা, আর আমার কথা মনে করবা কেমন। তার আচরণ, কথাবার্তা আমার ভালো লাগতো না, কিন্তু বড় ভাই বলে ভয় পেতাম। কিছু বলতে পারতাম না। আবার কখনো বলতো, আমার নাম মালেক। মালেক মানে হলো মালিক। আমি কার মালিক জানো?
আমি নিঃশব্দে দুপাশে মাথা দুলাতাম, না জানি না।
তখন বিজয়ের হাসি দিয়ে বলতো, যাও, আরেকটু বড় হলে বুঝবা। আমি তোমার মালিক।
আমি আরো বেশি ভয় পেয়ে মনে মনে গুন্ডা বলে ছুটে খেলার মাঠে চলে যেতাম। মাঝে মাঝে স্কুল ছুটির পর গুন্ডাটা বড় রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতো! বলতো, তুমি এখন বড় হচ্ছো, তোমার মাথার উপর আমি আছি এইটা পাবলিকেরে মাঝে মাঝে দেখাইতে হয়। আমার এ কথা শুনলে কী যে গা জ্বলে যেতো! বান্ধবীরা খিলখিল হাসিতে ভেঙে পড়লে আমার কাছে ইনসাল্টিং ফিল হতো। তাই ঠোঁট বাঁকিয়ে বলতাম, ইসসস্…! আইসে আমার মালিক! নিজের চরকায় ত্যাল দেন, নাইলে চরকায় মরিচা পইড়া নষ্ট হইয়া যাইবো গা!
আবার সবাই হাসতে লুটিয়ে পড়তাম। ধীরে ধীরে
সে-ই আমাকে ভালবাসার মানে বোঝায়, বোঝায় ভালবাসার গভীরতা৷
কলেজ – ইউনিভার্সিটি লাইফে মালেক আর আমি আমরা দুজন তুমুল প্রেমে হাবুডুবু খেয়েছি৷ আমাদের প্রেমের কথা ঘাস, লতা-পাতা, বন্ধু মহল সবাই জানত৷ মালেক সবসময় আমাকে আগলে রাখত ভালবাসা দিয়ে। যদিও সে বরাবর সন্দেহ করত৷ মালেক আসলে আমাকে মানসিক অস্বস্তিতে রাখত, যাকে বলে অধিক ভালবাসার পীড়া দিতে পছন্দ করে৷ এভাবে ভালবাসার পথ হাঁটতে হাঁটতে আমরা সংসারে ঢুকে পড়লাম৷ সংসারে আমাদের ভালবাসার কমতি ছিল না৷ বিয়ের পর মালেক আমাকে বলেছে, সে নাকি আমার অত্তোটুকু মুখে চটাং চটাং কথা খুব এনজয় করতো। কিন্তু যৌথ পরিবারের টানাপোড়নে আর ভালবেসে বিয়ে করার অপরাধে আমার সাথে শুরু হলো অবহেলা। আমার কষ্ট বাড়তে থাকে৷ ধীরে ধীরে একাকীত্ব বোধ করতে থাকলাম৷ সংসার আর চাকরি চালিয়ে যাওয়াও আমার জন্য কষ্টকর হয়ে উঠছিল। কিন্তু মালেক আমাকে সাপোর্ট দিলে শক্তি এবং সাহস পেতাম। অথচ ও সব দেখেও যেন কিছু দেখত না৷ সে আমার মুখ দেখে বুঝত আমার ভেতর দিয়ে ঝড় বইয়ে যাচ্ছে কিন্তু কখনই সে আমার পাশে ঢাল হয়ে দাঁড়ায় নি৷ এমনকি চার বছর সংসার করার পরও তার সন্দেহের বাতিক কমেনি৷ তার এই সন্দেহের দাবদাহে আমি পুড়ে গেছি,জ্বলে গেছি…! আর সেই প্রেমিক মালেক দিনে দিনে ফ্যাকাশে হতে থাকলো। ভালোবাসা বিশ্বাসের জায়গা জুড়ে বসলো সন্দেহ, হীনমন্যতা। আমার চাকরিটা ছাড়াতে বাধ্য করলো। ঘরে বসে টুকটাক বিজনেস করি, সেটাও এখন সহ্য করে না। শুধু ঝগড়া! অবহেলা! শাসন!
শাসনে শাসনে কোথায় মরে গেছে সেই তিথি! হ্যা, একবার তো সত্যি সত্যি মরতেও চাইলাম।একদিকে সংসারের মানুষগুলোর জটিলতা অন্যদিকে স্বামীর অবহেলা…. এক রাতে স্বামীর চোখের সামনেই ফ্যানের সাথে কাপড় পেঁচিয়ে ঝুলে পড়ি আমি। রাগে অপমানে তখন আমি হিতাহিতজ্ঞানশূন্য, কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো,
সে আমাকে থামানোর চেষ্টা না করে প্ররোচিত করতে থাকলো আত্মহত্যা করার জন্য! আমার কী থেকে কী হলো, নিজের জীবনের মায়া দূরে থাক,ঘেন্না হতে লাগলো। উফ! কী বিভৎস একটা স্মৃতি! যখন জ্ঞান ফিরে শুনলাম মালেক আমাকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখে আমাকে বাঁচানো বাদ দিয়ে মোবাইলে ভিডিও করছিল, এবং আমার শ্বশুড়-শাশুড়ি এসে আমাকে ঝুলন্ত অবস্থা থেকে নামিয়ে আমাকে বাঁচিয়েছেন ৷ তখন থেকে আমি জীবিত লাশ হয়ে শুধু সমন্বয় করে চলা শিখলাম।
পুরো একটা মাস আমার গলায় কলঙ্কের দাগের মত দাগ ছিল ওড়না কেটে বসে যাওয়ার। কী লজ্জার কথা! কী ভীষণ অপমান! এখনো মনে পড়লে মাটির সাথে মিশে যেতে ইচ্ছে করে। যে প্রেম না পাওয়ার জন্য আত্মাহুতির চেষ্টা, সেই প্রেমের মৃত্যুর মাঝে আমার আবার নতুন জীবন ফিরে পাওয়া। যে মালেক আমার তিরস্কার, অবহেলা, চলা বলা সবকিছুকে ভালোবাসতো, সবকিছুতে মুগ্ধ হতো সেই মালেক আমাকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচতে চেষ্টা না করে ভিডিওতে ধারণ করছিল আমার মৃত্যু যন্ত্রণা। তাহলে কী আমার যন্ত্রণাকেও সে ভালোবাসে? ওর বিনোদন? আর সেজন্যই সে আমাকে জেনে বুঝে কষ্ট দেয়? এটা কী ওর বিকৃতি? কী জানি বুঝি না! মানুষকে বুঝে ওঠার মত কঠিন কাজ পৃথিবীতে আর কী আছে? পৃথিবীতে প্রতিটি প্রাণীই দুর্বলের উপর অত্যাচার করে নানাভাবে। পুরুষেরা করে মানসিক অত্যাচার। আর তাই আমি আমার একরত্তি মেয়ে মৃত্তিকার কথাও ভাবিনি, কতটা স্বার্থপর হয়ে গিয়েছিলাম আমি নিজের আনন্দ বেদনা, সুখ শান্তির ব্যাপারে? কিন্তু সুখ শান্তি পেয়েছি কী? কী লাভ হতো মরে গেলে? এতোশত কষ্টের মাঝেও কী কিছু আনন্দ নেই? ক্লাস শেষে পুতুল মেয়েটা যখন দৌড়ে এসে আম্মু বলে যাপটে ধরে তখন কী আমি সুখী হই না? আমি না থাকলে ওর ব্যাকুল দুচোখ নিশ্চয় আমাকে খুঁজতো? আর ভীষণ ভীষণ অসহায় বোধ করতো। আসলে আত্মহত্যার চিন্তাটাই ভীষণ স্বার্থপরতা।
এই যে আজ বেঁচে আছি বলেই তো এই ভাবনাগুলো ভাবতে পারছি, লিখতে পারছি। শ্রাবণের সান্নিধ্যে আসতে পেরেছি। সে আমাকে ফাগুনের আনন্দ দিয়েছে৷ তাকে কল্পনা করে আমি ফাল্গুনের দিন সেজেছি, মনে আনন্দ নিয়ে ঘুরেছি একা একা৷ আশ্চর্য হয়ে উপলব্ধি করছি,ফাঁকা পথে, গার্ডেনে একা একা ঘুরার মধ্যেও কী অদ্ভুত এক পূর্ণতা! ভালো লাগা! ভরা ভরা লাগা! আমার সেই সময়ের সবটুকু অনুভূতির কথা বলার মত মানুষ হয়ে পাশে ছিল শ্রাবণ। তাকে কল করে প্রকাশ করেছি ফাগুনের রঙের কথা৷ মালেকের সাথে যখন আমার তুমুল প্রেম, তখনও এখনকার অনুভূতিতে আলোড়িত হইনি। তখনকার ভালোলাগা ছিল আরেক রকম। হয়তো কিছুটা অপরিণত। আহা কত বসন্ত পর এবার সাজলাম এমন করে। বলা যায় শ্রাবণই সাজালো আমাকে, আমি তাকে মনে করেই তো সেজেছি৷ আমাকে একটা নতুন পৃথিবীর স্বপ্ন দিয়েছে সে৷ আমার অসুখে মুখে তুলে খাইয়ে দিয়েছে৷ কী ভীষণ আবেগে আমার গালে তাঁর হাত ছুঁয়ে ছুয়ে গেছে…ভালবাসার পরশ দিয়ে বলেছে, বালিকা সুস্থ হয়ে ওঠো৷ ঘুরে বেড়াব তোমাকে নিয়ে৷ অসুস্থতা তোমাকে মানায় না।
আহা জীবন…আমি যে এক মূহুর্তও শ্রাবণকে না ভেবে থাকতে পারি না…আমি যে এখনো তাকে ভেবে অশ্রুসিক্ত হই। বাতাসে শ্রাবণের অনুভূতি টের পাই… কিন্তু কখনো যদি শ্রাবণ আমাকে ছেড়ে চলে যায়! ভীষণভাবে দুঃখ দেয়…আমি সেই দুঃখ বিরহ সয়ে বাঁচবো তো? নাকি ঘৃনা ভরে শ্রাবণকে ভুলে যাবো? নাকি ভাঙা কাঁচের চুড়ির মত টুকরো টুকরো স্মৃতি নিয়ে নিয়ে শ্রাবণের কাছ থেকে কিছু শোনার অপেক্ষায় আজীবন কাটিয়ে দেবো?
তিথির ভেতটা দুমড়ে মুচড়ে ওঠে। আর ভাবতে পারে না। রবিঠাকুরের গানের সুরটি কানে বাজতে থাকে….
“আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহদহন লাগে…তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে…
তবু প্রাণ নিত্যধারা, হাসে সূর্য চন্দ্র তারা,
বসন্ত নিকুঞ্জে আসে বিচিত্র রাগে ॥”
শ্রাবণ জানে সুমী তাকে খুব ভালবাসে, যত্ন করে৷ সুমী খুব সংসারী মেয়ে৷ শ্রাবণকে ভালবাসা দিয়ে আগলে রাখে সবসময় তবে কিছুটা ডোমিনেটিং৷ তার ভাবনায় সবসময় শুধু তার স্বামী আর সন্তানেরা৷ সংসারে সুখ বজায় রাখতে সুমী সবসময়ই নিষ্ঠাবান৷ সে তার স্বামীকে মানে, আমাকে অগাধ বিশ্বাস করে৷ আচ্ছা, সুমি কি বোকা? ভীষণ উদার? আমার প্রেমে অন্ধ? নাকি বেশি চালাক? সে আমার সাথে অন্য নারীদের সম্পর্ককে মূল্যহীন ভেবে সবকিছু সহজ চোখে দেখে। এ এক অসাধারণ ক্ষমতা সুমির। আমার প্রতিটি সম্পর্কে সুমি তাঁর স্বামীর লেখালেখির জন্য একেকটি চরিত্র ভাবতে পারে? যদিও তিথির সাথে সম্পর্কের কথা সুমি জানে না। তবে আমার বিশ্বাস, আমি যদি সুমিকে শুধু বোঝাতে পারি, উপন্যাসের প্রয়োজনে, গল্প কবিতায় প্রেমের অভিজ্ঞতার প্রয়োজনে তিথিকে আমি ভালোবেসেছি, অর্থাৎ পরোকিয়া কেমন হয় সেই অভিজ্ঞতা অর্জন করা প্রয়োজন ছিল, তবে সুমি ম্যানেজ হয়ে যাবে।
আচ্ছা, কখনো যদি আমার আর তিথির মত সুমিও অন্যকোন পুরুষের সাথে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে যায়, তখন আমার কেমন লাগবে? আমি কী পারবো সুমির মতো করে ভাবতে, সব কিছুকে সহজ চোখে দেখতে? সুমি যা বোঝাবে তাই অন্ধের মত বুঝে নিতে? যদি আমাদের সম্পর্কের কথা কোনভাবে মালেক সাহেব জানতে পারে, তিথির কী হবে তখন? সব ছেড়ে তিথি যদি আমার কাছে আসতে চায়?!
একটু নড়েচড়ে বসে শ্রাবণ। নিজের অজান্তে চোয়ালটা শক্ত হয়ে ওঠে। না, না, আমরা কমিটেড নই। আমাদের সম্পর্কের কোন পরিনাম নেই৷ আর সে কথা আমি বার বারই বলেছি তিথিকে।
নিজের অজান্তে শ্রাবণ ‘মি’ অর্থাৎ আমি। আমি মানেই সু-মি’র নাম্বারে কল করে।
সুমি ডার্লিং, আজকে কী রান্না করেছো?
কুচো মাছে আম দিয়ে চচ্চড়ি। মসুর ডাল আর আলু করলার ভাজি।
উফ! আর বলো না। মনে হচ্ছে অফিস থেকে এক দৌড়ে চলে আসি খেতে। তোমার হাতের চচ্চড়ি, আলু করলার ভাজির কোন তুলনা হয় না, আহ্! আজকে কিন্তু খেতে খেতে তোমার হাতও খেয়ে ফেলবো দেখো।
ইস! তোমার বয়স বাড়ছে সাথে সাথে প্রেমও বাড়ছে তাইনা? এসব কথা মোবাইলে বলছো, আশেপাশে তোমার কলিগরা নেই?
হুম! আছে। আমি আমার বউয়ের হাত খেয়ে ফেললে কোন ব্যাটার কী? তাছাড়া… এখন যৌবন যার, প্রেম করার শ্রেষ্ঠ সময় তার…।
কথাগুলো বলেই যেন ঘর কাঁপিয়ে হাহ্ হাহ্ হাসিতে ফেটে পড়ে শ্রাবণ। পাশাপাশি মনটা তিথির জন্য কেমন যেন খচখচও করে। একদিন তিথি জানতে চেয়েছিল,
আচ্ছা, এই যে আমি তোমার অফিস ছুটির সময়টাতে এপথ দিয়ে তোমার যাওয়ার অপেক্ষায় বসে থাকি, কখন যাও… কখন যাও…
আজ তোমার এক কথাতে চলে এলাম পার্কে। তুমি আমার হাতের পাতায় চুমু দিলে, এখন একসাথে গা ঘেঁষে বসে রিক্সায় ঘুরছি, আমরা কি অপরাধ করছি না?
উত্তরে বালেছিলাম, মোটেও না৷ ভালবাসায় কোন অপরাধ থাকে না সোনা। মানুষের জীবনে প্রেম ভালবাসা যে কোন সময়েই আসতেই পারে। তোমার এবং আমারও এসেছে। হয়তো টিনএজারদের মত আমরা হতে পারি না, হয়তো এই সম্পর্কের নাম পরিণামহীন বন্ধুত্বই রয়ে যাবে কিন্তু ভালোবাসা হারবে না। হারাতে চাই না তোমাকে… কথাগুলো বলতে বলতে আমি সত্যি সেই সময় একটা ঘোরের মাঝে ডুবে গিয়েছিলাম কী? তিথির হাতে আলতো করে চাপ দিতেই ওর হাতের কাঁচের চুড়িটা ভেঙে গেলো। খুব সামান্য একটু আঁচড়ও পড়েছিল তিথির হাতে। জানি না কেন এমন হয়, আঁচড়টা যেন আমার বুকের গভীরে লাগলো। আমি খপ করে তিথির হাতটা ধরে চুমু দিতে থাকি। তিথি কাঁপতে শুরু করলো। তিথি কি ভয়ে কাঁপছিল? নাকি ভালো লাগায়? বোকার মত আমি তাৎক্ষণিক ওর হাতটা ছেড়ে দিলাম। ও খুব যত্ন করে চুড়ির টুকরো গুলো কুড়াতে শুরু করলো। দেখে আমি মুগ্ধ হলাম। সুমি হলে কি টুকরোগুলোর এমন যত্ন নিতো? না থাক। তুলনা করতে ভালো লাগছে না। আমার এখন ইচ্ছে করছে অনেকক্ষণ তিথিকে জড়িয়ে রাখি। ওর কপালে চুমু দিয়ে সময়টুকু উপভোগ করি। তাই বলেই ফেললাম, বালিকা এত ভেব না৷ সময়ই সব ঠিক করে দিবে৷ ঘর-সংসার সবদিক মিলিয়েই আমাদের চলতে হবে৷ আমি জানি মালেক সাহেবও তোমাকে ভালবাসেন। আসলে তোমার চমৎকার ব্যক্তিত্বের প্রতি আকৃষ্ট না হয়ে দূরে যে থাকাই যাই না তিথিয়া মনি।
তবে আমাদেরকে সতর্ক থাকতে হবে। আর এই সতর্ক হয়ে চলাটা একেবারে সহজ নয়।
শ্রাবণ আপন মনেই ভাবে, সুমি এবং তিথির সাথে তাল মিলিয়ে চলছি বটে, তবুও মনের মধ্যে কোথায় যেন খচখচ করে। আমি কি ওদেরকে নিয়ে খেলছি? মোটেই না। আমি কবি। আমি লেখক। আর এটা সর্বজন জ্ঞাত যে, কবি লেখকেরা অনেক বেশি আবেগপ্রবণ। কল্পনা প্রেমী। তাদের আলাদা একটা জীবন থাকে। আলাদা একটা জগত! সেখানে সত্যিকারের যদি ভক্ত পাঠক হৃদয়ে জায়গা দেয় তাহলে কবির তো তা গ্রহণ করা বাধ্যতামুলক হয়ে যায়। প্রেম তো লেখা লেখির জন্য অবধারিত! তিথি দেখতে হয়তো আহামরি কিছু না। অনেক সুন্দরী কবিকে টোকা দিলে হয়তো অনায়াসে লুফে নিতো আমার প্রস্তাবিত প্রেম। কিন্তু ওই সুন্দরীরা কি কম যায়? তারা থাকেন আরেক ধান্দায়! অগ্রজ বয়স্ক সনামধন্য সুন্দরী কবিদের সিঁড়ি মাত্র! হা হা হা…! আমার প্রয়োজন নির্জলা টলটলে প্রেমের স্বাদ নেয়া। প্রেমিকা হবে ঠিক বালিকার মত। ভীতু কিন্তু চঞ্চলা হরিণী। প্রেমের দ্বিতীয় স্বাদ, তৃতীয় স্বাদ কেমন, সেটাই আরোহণ করতে হবে আমার লেখালেখি শানিত করতে হলে। সুতরাং আমিই বা এতো ভাবছি কেন?
নিজেকে চিয়ারআপ করে শ্রাবণ। তিথিকে উৎসর্গ করে নিজের লেখা প্রেমের কবিতা আবৃত্তি করতে থাকে। শ্রাবণের প্রাণচাঞ্চল্যে, কথায়, কবিতার ভেলায় ভাসতে থাকে তিথি৷ মুগ্ধতায় ডুবে যায় কবিতার জগতে৷ সত্যিই তো, এতসব ভেবে কী লাভ? শ্রাবণ তো পাশেই আছে, বরং অদ্ভুত এই সময়টা আমরা উপভোগ করতে থাকি। শ্রাবণ তাকে গান, কবিতা শোনায় আর তিথি তা মুগ্ধতার সাথে শোনে৷ তাদের দুজনের পছন্দের গানগুলো শুনতে শুনতে জীবনটাকে মধুময় মনে হতে থাকে৷ কখনো আবার আত্মজীবনীমূলক অনুপ্রেরণার গল্পও হয়। স্বপ্ন, পরিবার, বন্ধু, বাস্তবতা ভালবাসার পরিণতি সব…! সবকিছু যেন হুড়মুড় করে ঢুকে যায় ভাবনার মাঝে। নেতিয়ে পড়া তিথি তবুও পরিণামহীন ভালবাসার বর্ষনে বুদ হয়ে যায়৷ শ্রাবণের স্বপ্নে বিভোর তিথির এখন সাজতে ভাল লাগে, হাসি-খুশি থাকতে ভালবাসে৷ একা একা কল্পনায় আনমনে শ্রাবণের হাত ধরে হাঁটতে ভাল লাগে৷ বর্ষায় ও বসন্তে শ্রাবণের জন্য নিজেকে সাজাতেও খুব ভাল লাগে৷ ভোর থেকে সকাল, দুপুর, বিকেল, সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত-পুরোটা সময়েই দুজন দুজনের ভাবনার বেড়াজালে আবদ্ধ থাকতে শুরু করে। তিথির চরিত্র ফুটে উঠতে থাকে শ্রাবণের হাতের পরশে৷ সে নিজেকে খুলে ধরতে ধরতে এক সময় বুঝতে পারে তার জীবনে তার স্বামীর অস্তিত্ব বিলীন হতে চলেছে৷ তাদের বিশ বছরের দাম্পত্য সম্পর্ককে ভিত্তিহীন করে দিয়েছে এক বছরের পরিনামহীন বন্ধুত্বের সম্পর্ক৷
শ্রাবণ! আহা শ্রাবণ… এমন করে শ্রাবণ ধারার মত এসে আমাকে ভেজালে কেন? আমি তো এখন ডুবেও মরতে পারবো না!
তোমাকে মরতে দিলে তো? উম্মাহ্..! এইটা দিলাম তোমার ঠোঁটে। এবার আমাকেও দাও।
মোবাইলে চুমু?…. না… না..আমি পারি না এসব।
শুধু চুমুর শব্দ করো। এই যেমন আমি করছি, আউউমমমম্মাহ্… এইটা তোমার পেটে দিলাম।
তিথির সমস্ত শরীরে মোচড় ওঠে। অসম্ভব শিহরণে কেঁপে ওঠে শরীরের ভাঁজগুলো।
উফ্! কত কাল এমন আবেগী কথা শুনি না! কতকাল এমন আদর পায় না আমার শরীর! হৃদয়ের পরিচর্যা হয় না কত যুগ!
শ্রাবণ মোবাইলের ওপাশে জড়ানো গলায় বলতে শুরু করে,
আমার তিথি! আমার মধুবালা…তুমি… তুমি আমার ঠোঁটের স্পর্শে গলে যাও মধুবালা চা।
পাউরুটি ক্রিমের স্বাদ হয়ে লেগে আছ আমার জিহবায়।
চশমা খুলে সম্মুখে তাকাতেই
নীলনদের মোহনীয় আলোক সজ্জায়
তোমার শাড়ির আঁচলে দেখি
খুনসুটি করছে বৈশাখী বাতাস।
আঙুলের ফাঁকে সিগারেট ছিল না,
অথচ পোড়া গন্ধের তীব্র ঝাঁঝ নাকে আসতেই
বুঝতে পারি, তোমার কুমারী চোখে বিলুপ্ত হয়ে গেছে একবিংশের সভ্যতা…
বর্ষাস্নাত দোলনচাঁপা ঘ্রাণ হয়ে
আমার গায়ে, গলায়, চিবুকে, লেগে আছো তুমি।
সমস্ত শুদ্ধতায় আমার বুকবিছানায় এসো… আমার হাত বালিশে যাপন করো
তোমার অখন্ড অবকাশ !
তুমি তো জানো, বৃষ্টির শীতল হৃদয়ে থাকে
সবুজ জীবাশ্মের জন্মের ইতিকথা
যেমনটি আমিও জেনেছি
হাত বাড়ালেই পাওয়া যায় নদীর হৃদয়,
অবগাহনের নিঃস্তব্ধতা ভেঙে কিছু শব্দ
কূলে পৌছানোর ক্লান্তি মুছে দেয়…
তবে এসো প্রসারিত সোনালু বাহুতে
প্রশস্ত করো তোমার জলের শরীর।
তিথিয়া, দেখো তো কবিতায় তোমার সৌরভ জড়িয়ে আছে কীনা? ছড়িয়ে আছে কীনা?
উফফ্…শ্রাবণ…কতভাবেই না তুমি আমাকে পাগল করে তুলেছো! ডুবিয়ে রেখেছো ভাষায়, পঙক্তিমালায়৷ আমাকে… তুমি ভাসাও শ্রাবণ… যতটা পারো আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে চলো অসম্ভব প্রেমময় এক দুনিয়ায়। আমি তোমার আরও কাছে যেতে যাই… আরও… আরও…
নিজেকে আর ধরে রাখতে পারে না তিথি। অবাক হয়ে আবিষ্কার করে অচেনা আরেক তিথিকে। শ্রাবণের মিলনসুধায় পরিপূর্ণ হতে চায় সে নিজেই। একটা মানুষের ভেতরেই যেমন অনেকগুলো মানুষের বসবাস থাকে! তেমনি যেন এক শরীরের ভেতরে অচেনা আনেক লুকিয়ে থাকা শরীর পাগল করে দেয় তাকে। তিথি দেখতে পায় নিজের ভেতরের ঘুমন্ত মানুষটা জেগে উঠতে শুরু করেছে৷ শ্রাবণই সেই শরীরের অনুভূতিগুলোকে জাগিয়ে তুলেছে আদরে, গানে, কবিতায়। এই স্রোতের বিপরীতে টিকে থাকা এখন দুজনেরই অসম্ভব। ধীরে ধীরে দুজন মানুষ কাছে আসতে থাকে৷ ডুবে যায় একে অপরের ভেতরে।
তিথি অবাক হয়ে ভাবে, মালেকের সাথে তিথির সব গল্প, সব ভালোলাগা কখন কবে নিঃশব্দে উধাও হয়ে গেছে? এক দুইদিন পর পর কী বিশ্রী কমার্শিয়াল দৈহিক চাহিদা পূরণ করে মালেক! যেন এমন না করলে বউ টিকবে না। যেন নিতান্তই প্রয়োজনে করতে হয় তাই করা। মালেকের সাথে শারীরিক সম্পর্ক শেষ হওয়ার পরে কত রাত যে অজানা ব্যথায় তিথির চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে গেছে সে কথা কেউ জানে না। কেউ দেখেনি সেই দৃশ্য! আসলে মেয়েদের আবেগ কখনো ফুরায় না। কিন্তু প্রেমিক স্বামী হওয়ার পর আর প্রেমিক থাকে না। শুধু স্বামীই হয়ে যায়!
অনেকেই বলে স্ত্রীর কারণে স্বামীরা নষ্ট হয়। কিন্তু স্বামীর অবহেলা, প্রতিনিয়ত স্ত্রীকে মিথ্যা সন্দেহ করে ছোট করাতে কী স্ত্রীর মন ভাঙে না? স্বামীর অহেতুক শাসনে শাসনে কী দূরত্ব বা ঘৃণার সৃষ্টি হয় না? স্ত্রী কী বিপথগামী হতে পারে না স্বামীর মানসিক অত্যাচারের কারণে? পারে বলেই হয়তো আজ কবি বউয়ের মাঝে আমাকে খুঁজে পেতে শুরু করেছে। আর আমিও কবির ভেতর পুরনো প্রেমিক মালেকের ছায়া দেখে স্বামী মালেককে ভুলে ছায়ার পেছনে চলতে শুরু করেছি। মন্দ কী? এভাবেই কাটুক না আমাদের মাঝের না পাওয়া সময়টুকু স্বপ্ন আর কল্পনার অসীম জগতে ভেসে। কাটুক শ্রাবণের ঘ্রাণ বাতাসের ফিসফিসানিতে টের পেয়ে। আজীবন কেটে যাক প্রত্যাশিত কিছু প্রতিশ্রুতি চেয়ে। কিছু ভাবনার অশ্রু মিশে যাক শ্রাবণে।
❤